আউটসোর্সিং কি? | আউটসোর্সিং এর সুবিধা ও অসুবিধা
আউটসোর্সিং একটি ব্যবসায়িক কৌশল, যেখানে একটি কোম্পানি বা সংস্থা তার কিছু কাজ বা কার্যক্রম অন্য একটি বাহ্যিক প্রতিষ্ঠান বা কর্মীকে দিয়ে সম্পন্ন করে। এটি সাধারণত একটি কার্যকরী উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয় যখন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বা প্রক্রিয়া সীমিত থাকে এবং অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সেই কাজটি সঠিকভাবে করতে সক্ষম হয়।
আউটসোর্সিং একটি ধরনের কাজের বিভাজন, যা কোম্পানিকে কিছু কাজের জন্য বাহ্যিক বা তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিতে সাহায্য করে।
এই প্রক্রিয়ায়, কোম্পানি তাদের কিছু বা সব কাজ অন্য প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে সরবরাহ করে এবং সাধারণত তাদের নির্দিষ্ট চুক্তি, সময়সীমা এবং শর্তাবলী অনুযায়ী কাজটি সম্পন্ন করা হয়। আউটসোর্সিং পৃথিবীজুড়ে একটি জনপ্রিয় কৌশল, বিশেষ করে ব্যবসা পরিচালনা এবং সেবা প্রদান ক্ষেত্রগুলিতে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব কাজের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারে, এবং দক্ষতার সাথে খরচ কমাতে সক্ষম হয়।
আউটসোর্সিংয়ের প্রকারভেদ
আউটসোর্সিং সাধারণত বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। এটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন ও প্রয়োজনে নির্ভর করে যে তারা কোন ধরনের আউটসোর্সিং চায়। প্রধান প্রকারগুলো হলো:
অনশোর আউটসোর্সিং (Onshore Outsourcing):
এই ধরনের আউটসোর্সিংয়ে, কাজটি এমন একটি কোম্পানির কাছে দেওয়া হয় যা একই দেশে অবস্থিত। অর্থাৎ, কাজটি সেই দেশের প্রতিষ্ঠান বা কর্মীদের কাছে যাবে, যেখানে কোম্পানি অবস্থিত।
উদাহরণস্বরূপ, একটি মার্কিন কোম্পানি তাদের গ্রাহক সহায়তা সেবা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আউটসোর্স করতে পারে।
অফশোর আউটসোর্সিং (Offshore Outsourcing):
অফশোর আউটসোর্সিংয়ে, কাজটি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে যায়, যা একেবারে অন্য দেশে অবস্থিত। এটি সাধারণত খরচ সাশ্রয়ী করার জন্য করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, একটি ইউরোপীয় কোম্পানি তাদের ওয়েব ডিজাইন বা গ্রাফিক ডিজাইন সেবা ভারত বা ফিলিপিন্সের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্স করতে পারে, কারণ সেখানে খরচ কম হয়।
নearshore আউটসোর্সিং (Nearshore Outsourcing):
এই ধরনের আউটসোর্সিংয়ে, কাজটি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয় যা ভৌগোলিকভাবে একেবারে কাছাকাছি অবস্থিত।
উদাহরণস্বরূপ, একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি মেক্সিকো বা ক্যানাডার প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্স করতে পারে।
আউটসোর্সিংয়ের সুবিধা
আউটসোর্সিং অনেক ধরনের সুবিধা প্রদান করে, যার মধ্যে কিছু প্রধান সুবিধা নিচে আলোচনা করা হলো:
খরচ কমানো
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের খরচ কমাতে পারে। যখন কোম্পানিগুলো অভ্যন্তরীণ কাজের জন্য লোক নিয়োগ করতে চায়, তখন তাদেরকে উচ্চতর বেতন দিতে হয়। তবে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তারা এমন কর্মীদের নিয়োগ করতে পারে যারা কম খরচে দক্ষ সেবা দিতে পারেন, বিশেষত যখন তারা অন্যান্য দেশে আউটসোর্সিং করে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের সেবা পাওয়া
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি কোম্পানি তাদের ওয়েবসাইট ডিজাইন করার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ গ্রাফিক ডিজাইনার নিয়োগ করতে পারে, যার কাছে বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্পানি সেরা মানের কাজ পেতে পারে।
কাজের গতি বৃদ্ধি
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজের গতি বৃদ্ধি পায়, কারণ একাধিক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করার জন্য নিয়োজিত হতে পারে। এটি বিশেষত বড় প্রকল্প বা কাজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী।
কেন্দ্রীভূত কার্যক্রমে মনোযোগ
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একটি কোম্পানি তার মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রমে মনোযোগ দিতে পারে। যখন একটি কোম্পানি তাদের অপ্রয়োজনীয় কাজ আউটসোর্স করে, তখন তারা তাদের মূল সেবা বা উৎপাদন প্রক্রিয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারে।
ঝুঁকি ভাগাভাগি
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলি ঝুঁকি ভাগাভাগি করতে পারে। যখন অনেক কাজ একসাথে করা হয়, তখন প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি আইটি কোম্পানি তার সিস্টেমের নিরাপত্তা এবং ডাটা ব্যাকআপ আউটসোর্স করে ঝুঁকি কমাতে পারে।
আউটসোর্সিংয়ের অসুবিধা
যদিও আউটসোর্সিং অনেক সুবিধা প্রদান করে, তবুও এর কিছু অসুবিধা রয়েছে, যা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। কিছু প্রধান অসুবিধা নিচে আলোচনা করা হলো:
যোগাযোগের সমস্যা
আউটসোর্সিংয়ের সময় একাধিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির মধ্যে যোগাযোগের সমস্যা হতে পারে, বিশেষত যদি তারা বিভিন্ন দেশের বা সংস্কৃতির হয়। ভাষাগত সমস্যা, টাইম জোনের পার্থক্য এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্যগুলো কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে গোপনীয় তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের তথ্য তৃতীয় পক্ষের হাতে তুলে দেয়, যা কখনো কখনো নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।
মান নিয়ন্ত্রণ
আউটসোর্সিংয়ে মান নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যখন কাজটি বাহ্যিক উৎসের মাধ্যমে করা হয়, তখন অনেক সময় তা প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যাশা অনুযায়ী হতে পারে না। যদি মান বজায় রাখা না হয়, তবে এটি কোম্পানির সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
কর্মী নিয়ন্ত্রণের অভাব
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণের পরিসর সীমিত হয়ে পড়ে, কারণ বাহ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের উপর প্রতিষ্ঠানটির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কর্মীদের আচরণ এবং কর্মক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে।
কাস্টমার সাপোর্টের সমস্যা
গ্রাহক সেবা বা কাস্টমার সাপোর্ট আউটসোর্স করার সময়, গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। এটি বিশেষত তখন সমস্যা সৃষ্টি করে, যখন গ্রাহকের পছন্দের ভাষা বা সেবা মান মেলে না।
আউটসোর্সিংয়ের জনপ্রিয় ক্ষেত্র
আউটসোর্সিং বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু জনপ্রিয় ক্ষেত্র হলো:
আইটি এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট
ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি কাজ আউটসোর্স করা হয়।
গ্রাহক সহায়তা (Customer Support)
কল সেন্টার সেবা, গ্রাহক সেবা সহায়তা, টেকনিক্যাল সাপোর্ট ইত্যাদি কাজ আউটসোর্স করা হয়।
ডিজাইন ও কন্টেন্ট
গ্রাফিক ডিজাইন, কন্টেন্ট রাইটিং, SEO (Search Engine Optimization), সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ইত্যাদি কাজ আউটসোর্স করা হয়।
অ্যাকাউন্টিং ও ফাইন্যান্স
ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং, একাউন্টিং সেবা, পে-রোল ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি কাজ আউটসোর্স করা হয়।
আউটসোর্সিং একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক কৌশল যা কোম্পানিগুলোর জন্য অনেক সুবিধা এনে দিতে পারে। তবে এটি সঠিকভাবে পরিচালনা করা জরুরি, যাতে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় এবং যে সমস্ত অসুবিধা হতে পারে তা মোকাবিলা করা যায়।
সঠিক আউটসোর্সিং পার্টনার নির্বাচন, কার্যকরী যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রমে আরও দক্ষতা আনে, খরচ কমায়, এবং তাদের ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়।
আমাদের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url