ইন্টারনেট কি? ইন্টারনেট আবিষ্কারের ইতিহাস।
ইন্টারনেট হল একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক যা বিভিন্ন কম্পিউটার, ডিভাইস এবং সার্ভারকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত করে, যাতে তারা একে অপরের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে মেইল, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন শপিং, শিক্ষার সুযোগ, গেমিং, এবং আরও অনেক ধরনের যোগাযোগ, বিনোদন এবং পরিষেবা প্রদান করে।
ইন্টারনেট এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য খুব সহজেই পেতে পারে এবং বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, যা বর্তমান যুগের প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি এবং উন্নতির পেছনে কাজ করছে।
ইন্টারনেট শুধুমাত্র একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জন্যও একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কাজ করার, শিখন-গবেষণার, ব্যবসা পরিচালনার, এবং আরও অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তবে, ইন্টারনেটের আবিষ্কার একটি দীর্ঘ ইতিহাসের ফলস্বরূপ, যা বিভিন্ন উদ্ভাবন, গবেষণা এবং উন্নতির মাধ্যমে আজকের বর্তমান অবস্থানে এসেছে।
ইন্টারনেট আবিষ্কারের ইতিহাস
ইন্টারনেটের ইতিহাস বহু বছর আগে শুরু হলেও, এর প্রথম সূচনা ১৯৬০-এর দশকে ঘটে। এটি ছিল মূলত একটি গবেষণামূলক প্রকল্প যা কম্পিউটারের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে শুরু হয়। ইন্টারনেটের আবিষ্কারকে বলা যায় "প্রযুক্তির এক বিপ্লব", যা মানুষের জীবনে প্রযুক্তি ব্যবহারের ধারণাকে একদম নতুনভাবে তৈরি করেছে।
আরপানেট (ARPANET)
ইন্টারনেটের ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৯৬০-এর দশকে "আরপানেট" নামক একটি প্রাথমিক নেটওয়ার্ক প্রকল্পের মাধ্যমে। "আরপানেট" ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের (ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি বা DARPA) একটি উদ্যোগ, যার উদ্দেশ্য ছিল কম্পিউটারগুলোর মধ্যে তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান করার ব্যবস্থা তৈরি করা।
আরপানেটের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেনা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান করতে পারা, বিশেষ করে যদি কোনও সঙ্কট বা বিপদ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ১৯৬৯ সালে এই নেটওয়ার্কটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় এবং প্রথমবারের মতো ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস (UCLA), স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SRI), ইউনিভার্সিটি অব ইউটাহ এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারা (UCSB) – এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সংযুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।
টিসিপি/আইপি প্রোটোকল (TCP/IP Protocol)
আরপানেটের মাধ্যমে কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং চালু হওয়ার পর ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে আরপানেটের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি নতুন প্রোটোকল প্রবর্তিত হয়। এটি ছিল TCP/IP (Transmission Control Protocol/Internet Protocol), যা ইন্টারনেটের মৌলিক প্রোটোকল হিসেবে কাজ করতে শুরু করে।
১৯৮৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে টিসিপি/আইপি প্রোটোকল আনুষ্ঠানিকভাবে আরপানেটের নেটওয়ার্কে ব্যবহার শুরু হয় এবং এর মাধ্যমে ইন্টারনেটের গঠন আরও উন্নত এবং বিশ্বস্ত হয়।
টিসিপি/আইপি প্রোটোকল ইন্টারনেটের বিভিন্ন ডিভাইস ও সার্ভারের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম তৈরি করে, যার মাধ্যমে পৃথিবীজুড়ে তথ্যের আদান-প্রদান সহজ এবং সঠিকভাবে হতে পারে। এই প্রোটোকলের কারণে আজকের দিনে এত বিশাল এবং দ্রুতগতিতে কার্যকর ইন্টারনেট ব্যবস্থার সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে।
ডোমেইন নেম সিস্টেম (DNS)
১৯৮৩ সালে ডোমেইন নেম সিস্টেম (DNS) তৈরি করা হয়, যার মাধ্যমে ইন্টারনেটের ব্যবহারকারীরা সহজে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারে। DNS প্রোটোকল নামকরণ করে ওয়েবসাইটের ঠিকানা এবং তার আইপি অ্যাড্রেসের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে।
এর মাধ্যমে, ব্যবহারকারীরা কোন ওয়েবসাইটের নাম টাইপ করে সহজেই সেগুলোর আইপি অ্যাড্রেসে পৌঁছাতে পারেন, যা আগে কম্পিউটারের মাধ্যমে শুধুমাত্র নম্বর ভিত্তিক আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করে করা যেত।
ওয়েবের উদ্ভব (The World Wide Web)
১৯৮৯ সালে টিম বার্নার্স-লী, একজন ব্রিটিশ কম্পিউটার বিজ্ঞানী, প্রথম বিশ্বব্যাপী ওয়েব (World Wide Web বা WWW) তৈরি করার পরিকল্পনা করেন। তাঁর এই উদ্ভাবনটি ইন্টারনেটের তথ্যপ্রবাহকে আরও সহজ এবং ব্যবহারকারীদের জন্য সুবিধাজনক করে তোলে। ১৯৯১ সালে, তিনি প্রথম ওয়েবসাইটটি তৈরি করেন, যা ছিল একটি প্রাথমিক গবেষণা সাইট। এর মাধ্যমে ওয়েব ব্রাউজিং এবং ওয়েব পেজ তৈরি করার ধারণা শুরু হয়।
তাছাড়া, হাইপারটেক্সট এবং ইন্টারনেট ব্রাউজার এর মতো নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ওয়েব ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি ইন্টারনেটকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তোলে এবং বিশ্বব্যাপী ব্যবহারকারীদের জন্য এটি সহজ এবং আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
১৯৯০-এর দশক: বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা
১৯৯০-এর দশক শেষের দিকে ইন্টারনেট বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৯৫ সালে, মাইক্রোসফটের Windows 95 অপারেটিং সিস্টেম বাজারে আসার পর ইন্টারনেট ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। একই সময়, এমএমএস (Multimedia Messaging Service) এবং ই-মেইল পরিষেবা জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের জন্য ইন্টারনেট আরও সহজলভ্য হয়ে ওঠে।
১৯৯৮ সালে গুগল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর মাধ্যমে ইন্টারনেট অনুসন্ধান আরও কার্যকরী এবং সহজ হয়ে ওঠে। গুগল, ইয়াহু, অ্যামাজন, ফেসবুক, ইউটিউব এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইন্টারনেট বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপকভাবে প্রসারিত হতে থাকে।
ইন্টারনেটের বর্তমান অবস্থা
আজকের দিনে ইন্টারনেট অত্যন্ত দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছি না, বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, কর্ম, বাণিজ্য এবং বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা, অনলাইন শপিং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভার্চুয়াল হেলথ কেয়ার, গেমিং, এবং আরও অনেক কিছু এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে সম্ভব হচ্ছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের যে কোনও কোণ থেকে মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং পৃথিবীকে ছোট্ট করে দেখছে।
ইন্টারনেটের ইতিহাস একটি দীর্ঘ এবং উন্নতির ইতিহাস। এর শুরুটি ছিল প্রাথমিকভাবে সরকারী গবেষণা প্রকল্প হিসেবে, তবে সময়ের সাথে সাথে এটি পুরো পৃথিবীকে একে অপরের সাথে যুক্ত করে ফেলেছে। ইন্টারনেট আজকের যুগে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞানেও বড় ভূমিকা পালন করছে।
এর ভবিষ্যতও অত্যন্ত উজ্জ্বল, কারণ প্রযুক্তি এবং নেটওয়ার্কিংয়ের নতুন নতুন উদ্ভাবন ইন্টারনেটকে আরও শক্তিশালী এবং গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।
আমাদের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url