আউটসোর্সিং কাকে বলে ।
আউটসোর্সিং (Outsourcing) হল এমন একটি ব্যবসায়িক কৌশল, যেখানে একটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তাদের নির্দিষ্ট কাজ বা সেবা সম্পাদনের জন্য বাহ্যিক উৎস বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তাদের মূল কাজের জন্য বাহ্যিক সেবা গ্রহণ করে, যাতে প্রতিষ্ঠানটি মূল কার্যক্রমে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারে এবং অপারেশনাল খরচ কমাতে পারে।
আউটসোর্সিংয়ে সাধারণত এক দেশের প্রতিষ্ঠান অন্য দেশের কোম্পানি বা ফ্রিল্যান্সারদের কাছ থেকে পরিষেবা নেয়, যেটি সাধারণত কম খরচে সম্পাদিত হয়।
বিশ্বব্যাপী আউটসোর্সিং খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, এবং এটি বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, যেমন ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, কন্টেন্ট রাইটিং, ডেটা এন্ট্রি, কল সেন্টার সেবা, এবং আরও অনেক কিছু। আউটসোর্সিং সংস্থাগুলোর জন্য সাশ্রয়ী, দক্ষ এবং স্বল্প সময়ে ফলপ্রসূ কাজ পাওয়ার একটি কার্যকরী মাধ্যম।
আউটসোর্সিংয়ের ইতিহাস
আউটসোর্সিং ধারণাটি ১৯৮০-এর দশকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হতে শুরু করে। মূলত, বড় বড় সংস্থাগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রতিষ্ঠানগুলো, তাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ এবং সেবা আউটসোর্স করে, যার মাধ্যমে তারা খরচ কমাতে সক্ষম হয়।
প্রথমে আউটসোর্সিংয়ের প্রবণতা মূলত উৎপাদন ও কল সেন্টার পরিষেবাগুলোর জন্য ছিল, কিন্তু পরে এটি বিভিন্ন ক্ষেত্রের কাজ যেমন আইটি সেবা, ডিজিটাল মার্কেটিং, কন্টেন্ট রাইটিং ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল যোগাযোগ এবং ইন্টারনেটের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আউটসোর্সিং আরও সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে, এবং এর মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে, এটি বৈশ্বিক ব্যবসায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আউটসোর্সিংয়ের ধরন
আউটসোর্সিং বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্য হয়ে থাকে। নিচে আউটসোর্সিংয়ের কিছু সাধারণ ধরন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং
ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে কোনও প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি নির্দিষ্ট একটি কাজ বা প্রকল্প আউটসোর্স করে। এখানে, একটি কাজ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ফ্রিল্যান্সারদের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। ফ্রিল্যান্স প্ল্যাটফর্ম যেমন: Fiverr, Upwork, Freelancer, PeoplePerHour এর মাধ্যমে এই ধরনের আউটসোর্সিং হয়ে থাকে।
বিজনেস আউটসোর্সিং
বিজনেস আউটসোর্সিং হল একটি বৃহৎ প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের একটি অংশ বা সমগ্র কার্যক্রম অন্য প্রতিষ্ঠান বা সেবা প্রদানকারীকে দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মানবসম্পদ বা আইটি সেবা আউটসোর্স করতে পারে। এতে মূল কোম্পানি তার প্রাথমিক কাজের দিকে মনোযোগ দিতে পারে এবং আউটসোর্স করা কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়া হয়।
আউটসোর্সিং টু থার্ড পার্টি
এটি একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি প্রতিষ্ঠান তার কাজের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠান বা তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নেয়। একটি উদাহরণ হতে পারে কল সেন্টার সেবা প্রদানকারী একটি তৃতীয় পক্ষের কোম্পানির মাধ্যমে পরিষেবা গ্রহণ করা। এতে সময় এবং খরচ সাশ্রয় হয়।
আউটসোর্সিং টু দেশের বাইরে
এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে কোম্পানি তার দেশ থেকে বাইরে কাজের জন্য দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ দেয়। উন্নত দেশগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়া এ ধরনের আউটসোর্সিংয়ে তৃতীয় বিশ্ব দেশের, বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের শ্রমিকদের নিয়োগ দেয়। এর মাধ্যমে শ্রমিকরা কম খরচে দক্ষ সেবা প্রদান করতে পারে।
আউটসোর্সিংয়ের সুবিধা
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পাওয়া যায়। এই সুবিধাগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খরচ সাশ্রয়, দক্ষ কর্মী পাওয়া এবং সময় সাশ্রয়।
খরচ কমানো
আউটসোর্সিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো খরচ কমানো। অনেক সময় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আপনাকে একটি কাজের জন্য কম খরচে বেশি দক্ষ কর্মী পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমা দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগের খরচ অনেক বেশি, তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটি অনেক কম। এই ব্যবধান কাজে লাগিয়ে কোম্পানি তাদের খরচ কমাতে পারে।
বিশেষজ্ঞের সাহায্য পাওয়া
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো দক্ষ এবং অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের সাহায্য পেতে পারে, যারা তাদের প্রয়োজনীয় কাজ দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারেন। এটি মূল কোম্পানির কাজের মান উন্নত করতে সাহায্য করে।
কাজের গতি বৃদ্ধি
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। যখন একাধিক প্রতিষ্ঠান বা ফ্রিল্যান্সাররা একটি কাজের মধ্যে অংশগ্রহণ করে, তখন কাজের গতি বৃদ্ধি পায় এবং প্রকল্পটি সময়মতো শেষ হয়।
বিশ্বব্যাপী বাজারে প্রবেশ
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাজারকে বৈশ্বিকভাবে প্রসারিত করতে পারে। এই পদ্ধতিতে অন্য দেশের মানুষদের নিয়োগ দিয়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
আউটসোর্সিংয়ের চ্যালেঞ্জ
যদিও আউটসোর্সিংয়ের অনেক সুবিধা রয়েছে, তবুও এটি কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। আউটসোর্সিংয়ের কিছু সাধারণ চ্যালেঞ্জ হলো:
যোগাযোগের সমস্যা
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করার সময় ভাষা এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে কখনো কখনো যোগাযোগ সমস্যা হতে পারে। বিভিন্ন সময় অঞ্চলের ব্যবধান এবং ভাষাগত বাধা থেকে কাজের মান কমে যেতে পারে।
গোপনীয়তা এবং সুরক্ষা
কিছু সময়, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কোম্পানির গোপনীয় তথ্য বা কনফিডেন্সিয়াল ডাটা বাইরের সংস্থার কাছে চলে যায়। এটি সংস্থার তথ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
কাজের মান নিয়ন্ত্রণ
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কিছু সময় কাজের মানের প্রতি কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হতে পারে। যদি নিয়মিতভাবে কাজের মান পরীক্ষা না করা হয়, তাহলে এর গুণগত মানের কমতি দেখা দিতে পারে।
আউটসোর্সিংয়ের ভবিষ্যৎ
আউটসোর্সিংয়ের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল বলে মনে করা হচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নতি এবং বিশ্বায়নের ফলে আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিকে যেমন আউটসোর্সিং অনেক কোম্পানির জন্য লাভজনক, তেমনি অন্যদিকে এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জন্য কাজের সুযোগও তৈরি করছে।
সামনের দিনে নতুন নতুন প্রযুক্তি যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং এর প্রভাব আউটসোর্সিং ক্ষেত্রেও পড়বে এবং এটি আরও দক্ষ ও দ্রুততর হবে।
আউটসোর্সিং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশল যা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়ের সাফল্য ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করছে। এটি শুধুমাত্র বড় প্রতিষ্ঠানগুলোই নয়, ছোট প্রতিষ্ঠান এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও একটি মূল্যবান উপায় হিসেবে কাজ করছে।
তবে, এটি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে উপকারিতা পাওয়া যাবে, এবং সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সঠিক উপায়ে আউটসোর্সিং ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলি খরচ কমিয়ে এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে তাদের ব্যবসায়ের সফলতা অর্জন করতে পারে।
আমাদের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url